রাখাইন ইস্যুতে করিডর নয়, মানবিক সহায়তার 'পাথওয়ে' বিবেচনায়: বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা

বাংলাদেশ
বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের জন্য কোনো ‘করিডর’ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার কারো সঙ্গে আলোচনা করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আটকে পড়া ত্রাণ সরবরাহের বিকল্প চ্যানেল বা ‘পাথওয়ে’ তৈরির জাতিসংঘের একটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান তিনি।

মানবিক সংকট ও জাতিসংঘের প্রস্তাব:

তিনি বলেন, রাখাইনে বর্তমানে তীব্র মানবিক সংকট চলছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, রুট বন্ধ থাকায় সহায়তা পৌঁছানো যাচ্ছে না। জাতিসংঘ মহাসচিবের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ চাইলেই সীমান্ত পর্যন্ত একটি লজিস্টিক চ্যানেল তৈরির মাধ্যমে সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশের দৃষ্টিতে, রাখাইনে সহায়তা পৌঁছাতে পারলে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হবে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথও উন্মুক্ত হতে পারে।

করিডর নিয়ে বিভ্রান্তি:

সম্প্রতি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এক ব্রিফিংয়ে “নীতিগতভাবে করিডর দিতে রাজি” হয়েছেন বলে মন্তব্য করার পর ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। এ বিষয়ে খলিলুর রহমান বলেন, এটি ছিল "স্লিপ অব টাং", এবং সংশোধন করে পরে ‘পাথওয়ে’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “করিডর নিয়ে কোনো কথা হয়নি, এবং করিডর দেবো না।”

সেনাবাহিনীর সাথে মতপার্থক্যের গুঞ্জন:

সামাজিক মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের মতানৈক্য রয়েছে বলে যে গুজব ছড়িয়েছে, তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, “সেনাপ্রধানের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, এবং আমরা একই অবস্থানে আছি।”

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং প্রক্সি যুদ্ধ?

অনেকে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের উপর চাপ প্রয়োগ করছে যেন রাখাইনে করিডরের ব্যবস্থা নেয়া হয় এবং তারা চীনের প্রভাব হ্রাসে বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু খলিলুর রহমান এসব দাবি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “আমরা কারো চাপের মুখে নেই। যুক্তরাষ্ট্র, চীন—সবাইর সঙ্গে আলাপ করছি। কেউ চাপ দেয়নি।”

তিনি বলেন, করিডর প্রসঙ্গে কিছু বিদেশি সংবাদমাধ্যম থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। “মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি দেখানো হচ্ছে,” মন্তব্য করেন তিনি।

সীমান্ত ব্যবহারের সম্ভাব্য স্থান:

সীমান্তের কোন জায়গা দিয়ে ত্রাণ পৌঁছানো হতে পারে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সব পক্ষের সম্মতি এবং নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়েই ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত হবে।

আরাকান বাহিনী ও মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সংলাপ:

খলিলুর রহমান জানান, রাখাইনের প্রায় ৯০% এলাকার নিয়ন্ত্রণে থাকা আরাকান বাহিনীর সঙ্গে, এবং পাশাপাশি মিয়ানমার সরকারের সাথেও, জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে আলাপ চলছে। আরাকান বাহিনী রোহিঙ্গাদের প্রশাসনে অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি দিলেও বাংলাদেশ তা বাস্তবে দেখতে চায়।

বাংলাদেশের শর্তাবলি:

জাতিসংঘের প্রস্তাবে সম্মত হওয়ার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কয়েকটি শর্ত দেওয়া হয়েছে:

সকল পক্ষকে সম্মত হতে হবে;
ত্রাণ গ্রহণ ও বিতরণের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা যাবে না;
সহায়তা সামরিক কাজে ব্যবহার করা যাবে না;
সশস্ত্র সংঘাত থেকে বিরত থাকতে হবে;
রোহিঙ্গাদের প্রশাসনিক কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

নাগরিকত্ব বিতর্কের জবাব:

সাম্প্রতিক সময় রাজনৈতিক মহলে তার বিদেশি নাগরিকত্ব রয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি খারিজ করে খলিলুর রহমান বলেন, “আমার কোনো আমেরিকান পাসপোর্ট নেই। আমি কেবল বাংলাদেশের নাগরিক।”

খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকার রাখাইন অঞ্চলে মানবিক সহায়তা প্রদানের বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করছে। বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে বাংলাদেশ কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।