গাজায় যুদ্ধ ও মানবিক সংকট: পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থন হারাচ্ছে ইসরায়েল

আন্তর্জাতিক
২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের সশস্ত্র হামলার পর ইসরায়েল পূর্ণ সামরিক শক্তি নিয়ে গাজায় যে যুদ্ধ শুরু করে, তার অর্থ, অস্ত্র এবং পুনঃসরবরাহের মূল উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র। পশ্চিমা দেশগুলোর অধিকাংশই তখন ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছিল, বিশেষত হামাসের হাতে প্রায় ১২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে অপহরণের ঘটনায়।

তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ধরন ও মাত্রা নিয়ে এখন তার দীর্ঘদিনের মিত্র ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং কানাডা প্রকাশ্য সমালোচনায় নেমেছে। এই তিন দেশ সম্প্রতি এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলকে নতুন করে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, গাজার জনগণের দুর্ভোগ “অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে” এবং তারা “ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সম্প্রসারণের তীব্র বিরোধিতা” করছে।

নেতানিয়াহুর দাবি ছিল, এই অভিযান হামাসকে নিশ্চিহ্ন করা এবং জিম্মিদের মুক্তির জন্য জরুরি। কিন্তু ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা সেই যুক্তিকে অগ্রাহ্য করে বলেছে, এখনকার পরিস্থিতি আর আত্মরক্ষার সীমার মধ্যে নেই—বরং এটি একটি অমানবিক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া।

তারা ইসরায়েলকে মনে করিয়ে দিয়েছে, ৭ অক্টোবরের জঘন্য হামলার পরও তারা ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে গাজার পরিস্থিতি দেখে তাদের অবস্থান পাল্টে গেছে। নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে গাজায় ‘ন্যূনতম’ খাদ্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়াকে তারা সম্পূর্ণ অপর্যাপ্ত বলে অভিহিত করেছে।

প্রতিক্রিয়ায়, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ওই দেশগুলোর সমালোচনাকে “৭ অক্টোবরের গণহত্যার পুরস্কার” বলে কটাক্ষ করেছেন। তার মতে, হামাস যদি অস্ত্র ফেলে, জিম্মিদের মুক্তি দেয় এবং নির্বাসনে যেতে রাজি হয়, তবেই যুদ্ধ থামবে।

গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইতিমধ্যে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছে, যদিও তিনি তা ‘ইহুদি বিদ্বেষ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

সাম্প্রতিক একটি ঘটনা—২৩ মার্চ গাজায় ১৫ জন প্যারামেডিক ও ত্রাণকর্মীর উপর ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা—বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া উসকে দেয়। সেই হামলার ভিডিও প্রমাণ দেখায়, স্পষ্টভাবে চিহ্নিত অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিকেল কনভয়ের উপর ইচ্ছাকৃত হামলা চালানো হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।

এই ঘটনার পর থেকেই ইউরোপীয় মিত্ররা আরও কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বে একটি কড়া ভাষার বিবৃতি প্রকাশ পায়, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়, যদি ইসরায়েল সামরিক হামলা বন্ধ না করে এবং মানবিক সহায়তার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা না তুলে নেয়, তবে আরও কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

যদিও সেই পদক্ষেপ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবে নিষেধাজ্ঞা কিংবা ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আছে। এরই মধ্যে ফ্রান্স এমন স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছে এবং আগামী জুনে নিউইয়র্কে সৌদি আরবের সঙ্গে এক সম্মেলনে বিষয়টি সামনে আনতে পারে।

এদিকে যুক্তরাজ্যও ফ্রান্সের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে এই স্বীকৃতির বিষয়টি নিয়ে। ইসরায়েল এই পদক্ষেপের বিপক্ষে, কারণ তাদের মতে, এতে হামাসের হাতে বিজয় তুলে দেওয়া হবে। তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ভাষ্য থেকে পরিষ্কার যে, ইসরায়েলের ওপর তাদের আগের মতো প্রভাব আর নেই।

এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইসরায়েল পশ্চিমা সমর্থন ক্রমেই হারাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মহল ক্রমশ গাজার যুদ্ধের বিরুদ্ধে আরও একজোট হয়ে উঠছে।