প্রায় এক মাস ধরে চলমান যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অচলাবস্থা নিরসনে অবশেষে মুখ খুলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তাঁর দেওয়া সমাধান প্রস্তাব রিপাবলিকান নেতাদের আরও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে।
বৃহস্পতিবার রাতে নিজের সামাজিক মাধ্যম Truth Social-এ ট্রাম্প লিখেছেন, ডেমোক্র্যাটরা “পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে”, তাই রিপাবলিকানদের এখনই সেনেটে “নিউক্লিয়ার অপশন” প্রয়োগ করা উচিত—অর্থাৎ ফিলিবাস্টার ও ৬০ ভোটের বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিল পাস করা।
ট্রাম্পের ভাষায়, “ডেমোক্র্যাটরা স্টোন কোল্ড ‘ক্রেজি’। তাই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট—নিউক্লিয়ার অপশন চালু করো, ফিলিবাস্টার তুলে দাও, এবং আমেরিকাকে আবার মহান করো!”
এই প্রস্তাব ট্রাম্পের পক্ষ থেকে নতুন কিছু নয়। অতীতেও তিনি একাধিকবার রিপাবলিকান নেতাদের ফিলিবাস্টার তুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সেনেটের রিপাবলিকান নেতৃত্ব সবসময়ই এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। এবারও তাঁদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্যে অচলাবস্থা সমাধানের বদলে রিপাবলিকানদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। কারণ, এতে ডেমোক্র্যাটদের সেই যুক্তি আরও জোরদার হয়েছে যে, রিপাবলিকানরাই চাইলে নিজেরা এই অচলাবস্থা যেকোনো সময় শেষ করতে পারে।
জনমত রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে
ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসি নিউজের সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, ৪৫ শতাংশ আমেরিকান সরকার অচলাবস্থার জন্য ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের দায়ী করছেন। বিপরীতে মাত্র ৩৩ শতাংশ মানুষ ডেমোক্র্যাটদের দায়ী করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যদিও রিপাবলিকানদের হাতে সেনেটে “নিউক্লিয়ার অপশন” প্রয়োগের সুযোগ আছে, বাস্তবে তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফিলিবাস্টার তুলে দিলে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে ডেমোক্র্যাটরাও একই নিয়ম ব্যবহার করে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারবে।
রিপাবলিকান নেতৃত্বের আপত্তি
সেনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা জন থুন ফিলিবাস্টারকে “দেশকে অনেক খারাপ সিদ্ধান্ত থেকে রক্ষা করার এক ধরনের সুরক্ষা-প্রাচীর” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মুখপাত্র জানিয়েছেন, থুনের অবস্থান অপরিবর্তিত।
আরেক রিপাবলিকান সিনেটর জন বারাসো সতর্ক করেছেন, ফিলিবাস্টার তুলে দিলে ভবিষ্যতে ডেমোক্র্যাটরা পুয়ের্তো রিকো ও ওয়াশিংটন ডিসিকে রাজ্যের মর্যাদা দিতে পারে এবং সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে। হাউস স্পিকার মাইক জনসনও বলেন, এতে “আমেরিকা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে কোনো বাধা থাকবে না।”
ট্রাম্পের আগের ‘শেষ মুহূর্তের হস্তক্ষেপ’
এটি প্রথমবার নয় যে ট্রাম্প এভাবে শেষ মুহূর্তে দলের আলোচনায় হস্তক্ষেপ করছেন। ২০১৮ সালে তিনি হঠাৎ করেই শিশুস্বাস্থ্য বীমা কর্মসূচি (CHIP) সম্প্রসারণের বিরোধিতা করে রিপাবলিকান নেতৃত্বকে বিপাকে ফেলেছিলেন। একই বছরে আবার তিনি অভিবাসন ইস্যু নিয়ে নতুন দাবি তোলেন, যা আগের আলোচনার অংশ ছিল না।
সম্প্রতি, দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, ট্রাম্প ও ইলন মাস্ক একসঙ্গে কংগ্রেসের বাজেটচুক্তির বিরোধিতা করে সরকার বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেন।
দলের ভেতরে হতাশা
রিপাবলিকান নেতাদের অনেকেই ট্রাম্পের এই আচরণে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছেন। সিনেটর কেভিন ক্রেমার বলেন, “আমি খুব হতাশ। প্রেসিডেন্ট যদি আগে থেকেই নিজের অবস্থান জানাতেন, তাহলে আমরা অনেক ঝামেলা থেকে বাঁচতাম।”
তবুও এবারও ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে রিপাবলিকান নেতারা বিব্রত। তাঁরা এখন এমন এক অবস্থায় পড়েছেন, যেখানে ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে কেন তাঁরা প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী “নিউক্লিয়ার অপশন” ব্যবহার করছেন না।
হাউস স্পিকার মাইক জনসন শুক্রবার বলেন, “আপনি যা দেখছেন, তা মূলত প্রেসিডেন্টের হতাশার বহিঃপ্রকাশ।”
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের এমন হঠাৎ মন্তব্য দলীয় ঐক্য ও আলোচনার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করছে। এতে সরকার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠছে, এবং দায়ভার ক্রমেই রিপাবলিকানদের ঘাড়ে চেপে বসছে।