নতুন শুল্কে থমকে গেল পোশাক রপ্তানি

ব্যবসায়-বাণিজ্য
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশে হঠাৎ করে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করায় তৈরি পোশাক শিল্পসহ রপ্তানিনির্ভর খাতগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা। নতুন এই শুল্ক কারা বহন করবে—ক্রেতা না রপ্তানিকারক—তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা, উদ্বেগ আর হিসাবনিকাশ।

নতুন শুল্ক ঘোষণার পরপরই কিছু মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান রপ্তানি আদেশ স্থগিত করেছে। অনেকে কারখানাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানার চেষ্টা করছে, বাড়তি খরচ কে নেবে। আবার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে সাপ্তাহিক ছুটির পর বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার থেকে অধিকাংশ ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা।

এর মধ্যে একটি জটিল সমস্যা সামনে এসেছে—ইতোমধ্যে জাহাজে তোলা পণ্যে আগের শুল্ক ধরে প্রাইস ট্যাগ লাগানো আছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর সময় যদি নতুন শুল্ক কার্যকর হয়, তাহলে সেই ট্যাগ পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়বে। এই পরিবর্তন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় রপ্তানিকারকরা আরও উদ্বিগ্ন।

চট্টগ্রামভিত্তিক তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ওয়েল গ্রুপের পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখন আতঙ্কের মধ্যে আছি। আগেই রপ্তানি করা পণ্যের জন্য ক্রেতারা চুক্তিমূল্যের তুলনায় কম দাম দিতে চাইলে বা ডিসকাউন্ট দাবি করলে আমরা আর্থিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়ব।’

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, হঠাৎ করে ট্রাম্প প্রশাসনের এই শুল্ক আরোপ বাংলাদেশি পোশাক শিল্পকে বড় বিপদে ফেলেছে। অনেক রপ্তানি আদেশ স্থগিত হয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রাইস ট্যাগ নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় পণ্য গ্রহণে ক্রেতারা দ্বিধায় রয়েছেন। ফলে সময়মতো পণ্য বুঝে না নিলে অর্থ দেশে আসবে না।

বিজিএমইএর আরেক সাবেক সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মার্কিন ব্র্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তারা জানিয়েছেন, ছুটির পর অফিস খুললে চূড়ান্ত অবস্থান জানাবেন। ভিয়েতনামের মতো বাংলাদেশ সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছাতে পারে বলেও মত দেন তিনি।

এদিকে রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান বাবু মনে করেন, মার্কিন ক্রেতারাও নতুন শুল্ক নিয়ে ধোঁয়াশায় রয়েছেন। তাই অনেকেই এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি। অন্যদিকে, একজন উদ্যোক্তা জানান, তাঁর একটি চালানের পণ্য ২০ এপ্রিলের মধ্যে তৈরি হবে। কিন্তু বাড়তি শুল্ক কার্যকর হলে সেই পণ্যে শুল্ক বাড়বে প্রায় ৪ ডলার পর্যন্ত। এতে তার উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, যা হয়তো ক্রেতা মেনে নাও নিতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৈরি হয়ে যাওয়া পণ্যের ব্যাপারে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানো জরুরি। নতুন আদেশের ক্ষেত্রে নতুন শর্তে আলোচনা করেই এগোতে হবে।

উল্লেখ্য, তৈরি পোশাক বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮৭ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ প্রায় ২২ শতাংশ পণ্য রপ্তানি করে, যার ৭২০ কোটি ডলারের বেশি আসে শুধু পোশাক খাত থেকেই। অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, সিরামিক, কৃষিপণ্য, ফার্নিচার ও প্লাস্টিক সামগ্রী।

নতুন শুল্ক বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে এই বিপুল আয়ের খাতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কূটনৈতিকভাবে এ সমস্যার দ্রুত সমাধান খোঁজা।