ঢাকার পল্লবীর একটি সাধারণ বহুতল ভবন। প্রতিদিনের মতোই সেখানে চলছিল মানুষের ব্যস্ত জীবন। স্কুলে যাওয়া, বাজার করা, অফিসে যাওয়া, সন্ধ্যায় ছাদে হাঁটা—সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিকতার মাঝেই সাত বছরের এক শিশুর জীবন থেমে গেল এমন এক নৃশংসতায়, যা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো দেশকে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্কে নিমজ্জিত করেছে।
রামিসা আখতার। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। সদ্য পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিল। পরিবারের স্বপ্ন ছিল মেয়েটি বড় হয়ে চিকিৎসক হবে। কিন্তু সেই শিশুটিকেই পাশের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার পর শিরশ্ছেদ করা হয়—অভিযোগ অনুযায়ী, অপরাধ লুকানোর উদ্দেশ্যে। অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে অপরাধ স্বীকার করেছে।
রামিসার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এটি বাংলাদেশের শিশুদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতার এক ভয়াবহ প্রতীক মাত্র। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে অন্তত ১,৮৯০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮৩ জন নিহত, ৫৮০ জন ধর্ষণের শিকার এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার। একই সময়ে শিশু ধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছে।
এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি শিশুর কান্না, একটি পরিবারের ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ, এবং একটি সমাজের নৈতিক ব্যর্থতা।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে তথ্যটি সামনে আসে, তা হলো—শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে নিজেদের পরিচিত পরিবেশেই। গবেষণা ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি দশজন অপরাধীর মধ্যে নয়জনই শিশুর পরিচিত।
প্রতিবেশী, আত্মীয়, গৃহশিক্ষক, পরিবারের বন্ধু, এমনকি নিকটাত্মীয়—অপরাধীর তালিকায় তারাই বেশি। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নথিভুক্ত ধর্ষণের ঘটনায় ৪০.৫৮ শতাংশ অপরাধী ছিল প্রতিবেশী। অপরদিকে সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তির হার মাত্র ৯.৭৪ শতাংশ।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশের প্রচলিত সামাজিক ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দীর্ঘদিন ধরে পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে অনেক শিশুর জন্য সেই পরিচিত পরিবেশই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধীরা পরিচিত হওয়ার কারণে শিশুরা সহজে তাদের ফাঁদে পড়ে। তারা শিশুর বিশ্বাস অর্জন করে, পরিবারে অবাধ যাতায়াত তৈরি করে এবং সুযোগ বুঝে অপরাধ সংঘটিত করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশু ভয়, লজ্জা বা হুমকির কারণে মুখ খুলতে পারে না।
বাংলাদেশে যৌন সহিংসতার একটি বড় সমস্যা হলো “সাইলেন্স কালচার” বা নীরবতার সংস্কৃতি। পরিবারগুলো প্রায়ই সামাজিক সম্মান রক্ষার কথা চিন্তা করে ঘটনা গোপন রাখে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে দোষারোপ করা হয়, কিংবা তাকে চুপ থাকতে বাধ্য করা হয়। ফলে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুরা সাধারণত পরিচিত মানুষের কাছ থেকেই আদর, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা আশা করে। যখন সেই মানুষই নির্যাতক হয়ে ওঠে, তখন শিশুর মানসিক জগৎ ভেঙে পড়ে। অনেক শিশু আজীবন ট্রমা, আতঙ্ক, ঘুমের সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান বছর বছর বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠন, সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সহিংসতার ধরনও দিন দিন আরও নির্মম হচ্ছে।
২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই শিশু ধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশু হত্যা, অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন ও অনলাইন যৌন শোষণের ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), ব্লাস্ট, ব্র্যাক এবং ইউনিসেফের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ দেশের বড় অংশের ঘটনা কখনও থানায় পৌঁছায় না। অনেক পরিবার মামলা করে না, অনেক ঘটনা স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করা হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে যায়।
গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও জটিল। সেখানে সালিশ, সামাজিক চাপ ও নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শিশুর পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার আগেই আপস করতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার মতো অমানবিক সমাধানও চাপিয়ে দেওয়া হয়।
শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনও মূলত প্রতিক্রিয়াশীল—অর্থাৎ অপরাধ ঘটার পরে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিরোধমূলক কাঠামো দুর্বল। স্কুলভিত্তিক সচেতনতা, কমিউনিটি পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ, শিশুদের জন্য নিরাপদ রিপোর্টিং ব্যবস্থা এবং দ্রুত মনোসামাজিক সহায়তা—সব ক্ষেত্রেই বড় ঘাটতি রয়েছে।
এছাড়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে শিশুদের বিরুদ্ধে অনলাইন শোষণের নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা খুবই সীমিত। ফলে শিশুদের টার্গেট করে অনলাইন গ্রুমিং, ব্ল্যাকমেইল ও পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা বাড়ছে।
শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এটি বহু সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল।
অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন মানুষের মানসিক আচরণে বড় প্রভাব ফেলেছে। একদিকে পরিবারে যোগাযোগ কমছে, অন্যদিকে সামাজিক নজরদারিও দুর্বল হচ্ছে। ফলে বিকৃত মানসিকতার মানুষ সহজে অপরাধ করার সুযোগ পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি শিশু নির্যাতনের একটি বড় কারণ। ইয়াবা, গাঁজা, আইসসহ বিভিন্ন মাদকের বিস্তার সমাজে সহিংস প্রবণতা বাড়াচ্ছে। অনেক অপরাধী মাদকের প্রভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আবার মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অপরাধচক্রও শিশুদের টার্গেট করছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনিয়ন্ত্রিত পর্নোগ্রাফি ও সহিংস যৌন কনটেন্টের সহজলভ্যতা। ইন্টারনেটের মাধ্যমে অল্প বয়সী তরুণ ও কিশোররা বিকৃত যৌন আচরণে প্রভাবিত হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যৌন শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষা না থাকায় তারা বাস্তব সম্পর্ক, সম্মতি ও মানবিকতার ধারণা ছাড়াই বিকৃত আচরণে জড়িয়ে পড়ছে।
এছাড়া শিশুদের প্রতি সামাজিক মনোভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক পরিবার এখনও শিশুদের “নিজস্ব ব্যক্তি” হিসেবে দেখে না। শিশুদের মতামত, নিরাপত্তা বা মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হলেও তা চিহ্নিত হতে দেরি হয়।
মানবাধিকার কর্মীরা আরও বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতা ও নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের স্বাভাবিকীকরণও বিপজ্জনক। প্রতিদিনের ভাষা, কৌতুক, ভিডিও বা কনটেন্টের মাধ্যমে নারীর প্রতি অসম্মান ও যৌন সহিংসতাকে অনেক সময় বিনোদন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মানুষের সংবেদনশীলতা নষ্ট করে।
বাংলাদেশে শিশু ও নারী নির্যাতনের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো বিচারহীনতা। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলায় দণ্ডের হার মাত্র ৩ শতাংশ। বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামি খালাস পায়।
এই পরিসংখ্যান কেবল আইনি দুর্বলতার নয়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতীক।
আইনজীবীরা বলছেন, অধিকাংশ মামলায় তদন্ত দুর্বল হয়। ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহে অবহেলা, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর চাপ—সব মিলিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে।
অনেক ক্ষেত্রে শিশু ভিকটিমকে আদালতে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, যা তার জন্য দ্বিতীয়বার মানসিক নির্যাতনের মতো। আদালত, থানা ও হাসপাতাল—কোথাও শিশু-বান্ধব পরিবেশ যথেষ্ট নয়। ফলে পরিবারগুলো মামলা চালিয়ে যেতে অনুৎসাহিত হয়।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল থাকা সত্ত্বেও বহু মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে শেষ পর্যন্ত শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, শুধু কঠোর আইন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকা সত্ত্বেও অপরাধ কমেনি। কারণ অপরাধীরা জানে, ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম এবং বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল।
অপরাধবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চিততা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
শিশু সুরক্ষা শুধু রাষ্ট্রের দায় নয়; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সমাজের প্রত্যেক অংশের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অনেক পরিবার এখনও শিশুদের সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করে না। “খারাপ স্পর্শ”, ব্যক্তিগত সীমা, অনলাইন নিরাপত্তা বা সন্দেহজনক আচরণ সম্পর্কে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হয় না। ফলে শিশুরা বুঝতেই পারে না কখন তারা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
স্কুলগুলোতেও শিশু সুরক্ষা নীতিমালা দুর্বল। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলর নেই। যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। অনেক শিক্ষকও শিশু মনোবিজ্ঞান বা ট্রমা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষিত নন।
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নৈতিক শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ। মানবিকতা, সহমর্মিতা, সম্মানবোধ ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। একদিকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অনেক ঘটনা সামনে নিয়ে আসে, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা ছাড়া খবর প্রকাশের ফলে ভিকটিম পরিবার আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশুদের পরিচয় গোপন রাখা এবং ট্রমা-সচেতন প্রতিবেদন তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। প্রতিবেশী, শিক্ষক, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
শিশু নির্যাতনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর একটি হলো এর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব। শারীরিক ক্ষত অনেক সময় সেরে যায়, কিন্তু মানসিক ক্ষত বহু বছর ধরে বহন করতে হয়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুরা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD), বিষণ্নতা, আতঙ্ক, আত্মবিশ্বাসহীনতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মহত্যাপ্রবণ আচরণে আক্রান্ত হতে পারে। অনেক শিশু পড়াশোনায় আগ্রহ হারায়, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভয় পেতে শুরু করে।
বাংলাদেশে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও অত্যন্ত সীমিত। সরকারি হাসপাতালে শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা খুব কম। স্কুলভিত্তিক কাউন্সেলিং ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে অধিকাংশ শিশু প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিকটিম শিশুদের শুধু চিকিৎসা নয়, দীর্ঘমেয়াদি মনোসামাজিক সহায়তা দরকার। পরিবারকেও কাউন্সেলিং দিতে হবে, যাতে তারা শিশুকে দোষারোপ না করে বরং মানসিকভাবে পাশে দাঁড়াতে পারে।
এখন কী করা জরুরি: একটি ১২ দফা সংস্কার কর্মসূচি
বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা রোধে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নয়, সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতামত, গবেষণা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে নিম্নোক্ত ১২ দফা কর্মসূচি জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে:
শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সক্রিয় করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে।
ভুক্তভোগী পরিবার যাতে হুমকি বা চাপের মুখে মামলা প্রত্যাহার না করে, সে জন্য রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দিতে হবে।
থানা, হাসপাতাল ও আদালতে শিশুদের জন্য আলাদা কক্ষ, প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা ও কাউন্সেলর থাকতে হবে।
“গুড টাচ–ব্যাড টাচ”, অনলাইন নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষামূলক শিক্ষা প্রাথমিক স্তর থেকেই চালু করতে হবে।
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নিয়োগ জরুরি।
মাদক ব্যবসা ও সহজলভ্যতা কমাতে কার্যকর ও স্বচ্ছ অভিযান চালাতে হবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে এবং শিশুদের সাইবার নিরাপত্তা শিক্ষা দিতে হবে।
ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শিক্ষক, সমাজকর্মী, প্রশাসন ও অভিভাবকদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
অভিভাবকদের শিশু মনোবিজ্ঞান, নিরাপত্তা ও যোগাযোগ কৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
শিশু নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশে ট্রমা-সচেতন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রচার চালাতে হবে।
শুধু নীতি প্রণয়ন নয়, বাস্তবায়নের জন্য বাজেট, পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
রামিসা আখতার আর ফিরে আসবে না। তার স্কুলব্যাগ, বই, খাতা, পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার আনন্দ—সব থেমে গেছে এক নৃশংস অপরাধে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যু কি শুধু আরেকটি সংবাদ শিরোনাম হয়ে থাকবে?
বাংলাদেশে প্রতিটি শিশু নিরাপদে বড় হওয়ার অধিকার রাখে। সেই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু যখন একটি শিশু নিজের বাসার পাশের ফ্ল্যাটেও নিরাপদ থাকে না, তখন সেটি শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়—এটি পুরো সমাজের নৈতিক বিপর্যয়।
আজ প্রয়োজন কেবল ক্ষোভ প্রকাশ নয়, দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। শিশুদের কথা শুনতে হবে। পরিবার, স্কুল, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
কারণ প্রতিটি বিলম্ব, প্রতিটি অবহেলা, প্রতিটি ধামাচাপা—আরও একটি রামিসার মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্নে এখন আর নীরব থাকার সুযোগ নেই।