রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও হাইকোর্ট বেঞ্চ: ঐকমত্যে রাজনৈতিক দলগুলো, আসছে সংবিধান সংশোধন

রাজনীতি
রাজনৈতিক সংস্কার ও বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণে ঐকমত্যে পৌঁছেছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা সীমিত করার পাশাপাশি বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনে একমত হয়েছে তারা।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আয়োজিত সংলাপের নবম দিনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ সব রাজনৈতিক দল সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে সংশোধন এনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়ে নতুন কাঠামোর প্রস্তাবনা অনুমোদন করে।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সীমিত করার প্রস্তাব:
বর্তমান সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দণ্ডিত ব্যক্তিকে ক্ষমা করার অধিকার রাখলেও, এটি কার্যত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল। এই ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে রাজনৈতিক দলগুলো ভুক্তভোগীর সম্মতি, ক্ষতিপূরণ প্রদান ও একটি সুপারিশ কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে একমত হয়েছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত অপরাধে ভুক্তভোগীর অনুমতি ছাড়া ক্ষমা না করার প্রস্তাব উঠে আসে, যা বিএনপি, এনসিপিসহ অন্যান্য দল সমর্থন করে।

হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ: ঢাকার বাইরেও বিচারিক সমতা:
সংলাপে বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণে সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ গঠনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। যদিও বিএনপি শুরুতে সার্কিট বেঞ্চের পক্ষে থাকলেও পরে আপিল বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ সাপেক্ষে স্থায়ী বেঞ্চ গঠনের প্রস্তাবে সম্মত হয়।

কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, সংশোধনীতে উল্লেখ থাকবে—‘রাজধানীর বাইরে প্রতিটি বিভাগে প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ থাকবে।’

বিচার বিভাগকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করার দাবি:
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন তা ফ্যাসিস্ট দোসরদের প্রভাবমুক্ত হবে।” তিনি দাবি করেন, অতীতে অনেক বিচারক রাজনৈতিক নির্দেশনায় সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পরিপন্থী। এদের শুধু বদলি নয়, ফৌজদারি আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমা: রাজনৈতিক অপব্যবহারের অভিযোগ:
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অন্তত ২৭ জন ফাঁসির আসামিকে রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করেছেন, যাদের সবাই দলীয় সংশ্লিষ্টতায় ছিলেন।

এই বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষমা করে বিচার ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর সম্মতি ছাড়া ক্ষমা কখনও গ্রহণযোগ্য নয়।”

পরবর্তী ধাপ:
আগামী সোমবার থেকে আবার শুরু হচ্ছে সংলাপের নতুন পর্ব। দ্বিতীয় ধাপের এই ৯ দিনের সংলাপে মোট ১৩টি প্রস্তাবের মধ্যে ৫টিতে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

সংক্ষেপে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবসমূহ:

রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের আগে ভুক্তভোগীর মতামত ও ক্ষতিপূরণ বাধ্যতামূলক

হাইকোর্টের বিভাগীয় স্থায়ী বেঞ্চ গঠনের জন্য সংবিধান সংশোধন

ফ্যাসিবাদী বিচারক ও রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টদের বিচারের আওতায় আনা

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা

সংবিধানে সংশোধন আনতে সুপ্রিম কোর্টের মতামতের গুরুত্ব

এই ঐকমত্য ভবিষ্যতে একটি কার্যকর ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারী নেতারা।