পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ম-নীতি এবং রাষ্ট্রদূতের আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারীর বিরুদ্ধে। নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ কনসাল জেনারেলের কার্যালয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক ‘মতবিনিময় সভা’তে অংশগ্রহণ করাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা।
সরকারি অনুমোদন ছাড়াই রাষ্ট্রদূত আনসারী ৪ এপ্রিল নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটে সফর করেন। কূটনৈতিক প্রটোকল উপেক্ষা করে তাঁর এই সফরের প্রস্তাব এবং কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহায়তা করেন কনসাল জেনারেল নাজমুল হুদা। জানা যায়, উক্ত মতবিনিময় সভায় কনস্যুলেট অফিসের কর্মীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীদের ফোন ও ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সরকারি দপ্তরে দলীয় কার্যক্রম!
সভায় উপস্থিত বেশিরভাগ অতিথি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাষ্ট্রদূত আনসারী ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন বিএনপি নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের ফোন করে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানান। অথচ, কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূতের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটে কোনো সফর বা কার্যক্রম পরিচালনার আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি থাকা আবশ্যক। সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে পূর্বে অবহিত করার বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি।
প্রবাসীদের প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
নিউ ইয়র্ক প্রবাসী অনেক বাংলাদেশি কড়া ভাষায় এই সভার সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, কনসাল জেনারেলের অফিস একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যা কোনো রাজনৈতিক দলের সভাস্থল হতে পারে না। কেউ কেউ এ ঘটনাকে "রাষ্ট্রীয় অফিসের রাজনীতিকরণ" বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট নাসির খান পল বলেন, "রাষ্ট্রীয় অফিসে কোনো দলের সভা একেবারে নিষিদ্ধ এবং বেআইনি। কনসাল জেনারেলকে অবশ্যই এ ব্যাপারে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।" অপর এক প্রবাসী নেতা আল আমিন রাসেল মন্তব্য করেন, "আওয়ামী লীগ যা করত, এখন বিএনপি তা-ই করছে। কনস্যুলেট যেন তাদের পার্টি অফিসে পরিণত হয়েছে।"
বিএনপি নেতাদের ব্যাখ্যা
অন্যদিকে, বিএনপি নেতারা এই সভাকে ‘দলীয় সভা’ নয় বলে দাবি করছেন। বিএনপি নেতা জিল্লুর রহমান জিল্লু বলেন, “আমি শুধু কনস্যুলেট পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। সেখানে কমিউনিটির ফ্যাসিস্ট বিরোধী নেতৃত্বকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।” আকতার হোসেন বাদল জানান, "সরকারি দপ্তরে দলীয় কার্যকলাপ থাকা উচিত নয়, তবে দেশের সংকট নিয়ে সমন্বিত আলোচনা হতে পারে।"
রাষ্ট্রদূতের বিতর্কিত প্রতিক্রিয়া
ঘটনার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারীর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি এক বার্তায় সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, “আই লেট হিম ডাই”। পরবর্তী অনুরোধে তিনি জানান, "আমি এখন কাজে আছি", "এখন নিউ ইয়র্কে নাই, আমি কম্বোডিয়ায়"। শেষে শুধু "গুডবাই" বলে যোগাযোগ শেষ করেন।
উল্লেখ্য, আনসারী কূটনৈতিক ক্যারিয়ারের বাইরে একজন সাবেক সাংবাদিক। তাকে ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিশেষ বিবেচনায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও নিজেকে তিনি ‘জনসেবক’ ও ‘খ্যাতিমান কূটনীতিক’ হিসেবে বর্ণনা করেন, বাস্তবে তিনি কোনো বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তা নন।
প্রশ্ন রয়ে যায়...
নিয়মবহির্ভূতভাবে একজন রাষ্ট্রদূতের সরকারি দপ্তরে বসে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ‘মতবিনিময়’ সভা করা কতটা গ্রহণযোগ্য – এই প্রশ্ন এখন নিউ ইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।