ভাইরাসজনিত সংক্রমণও বাড়ায় হৃদরোগের ঝুঁকি: নতুন গবেষণার ফলাফল

জীবনযাপন
কোভিড-১৯ সংক্রমণ দীর্ঘদিন ধরেই হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো কার্ডিওভাসকুলার জটিলতার সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু), এইচআইভি, হেপাটাইটিস সি ও শিংলসসহ আরও বেশ কিছু ভাইরাসও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বুধবার জার্নাল অব দ্য আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন-এ প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে গত কয়েক দশকের ১৫৫টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ভাইরাসজনিত সংক্রমণ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়—সংক্রমণের পরপরই যেমন, তেমনি দীর্ঘমেয়াদেও।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সংক্রমণের পরবর্তী এক মাসে ছয় গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। অন্যদিকে, কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি সংক্রমণ না হওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি।

গবেষণার প্রধান লেখক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় লস অ্যাঞ্জেলেসের ডেভিড গেফেন স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক ড. কোসুকে কাওয়াই বলেন, “এই ঝুঁকি প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায় হলো টিকা গ্রহণ। আমরা সাধারণত ইনফ্লুয়েঞ্জা বা অন্যান্য ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য টিকা নিই, কিন্তু এসব টিকা হৃদরোগ প্রতিরোধেও অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে পারে।”

গবেষকরা বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও কোভিড-১৯ সংক্রমণ তীব্র কার্ডিওভাসকুলার জটিলতা যেমন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়, আর এইচআইভি, হেপাটাইটিস সি ও শিংলসের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদে করোনারি হার্ট ডিজিজ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

এছাড়াও, সাইটোমেগালোভাইরাস, হারপিস সিমপ্লেক্স, হেপাটাইটিস এ, এইচপিভি, আরএসভি, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার সঙ্গেও হৃদরোগের সম্পর্ক পাওয়া গেছে, যদিও এই সম্পর্ক নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভাইরাস কীভাবে হৃদয়ে প্রভাব ফেলে?

ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের সংক্রমণ প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ ড. স্কট রবার্টস বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক ভাইরাসই এমন প্রভাব ফেলতে পারে।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসগুলো মূলত দুইভাবে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়—পরোক্ষভাবে, অতিসক্রিয় ইমিউন প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরে প্রদাহ ও রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা সৃষ্টি করে, যা হৃদয়ে চাপ ফেলে। সরাসরি, যখন ভাইরাস নিজেই হৃদ্‌পেশিকে আক্রমণ করে।

কোভিড-১৯, ফ্লু ও আরএসভি সাধারণত পরোক্ষ উপায়ে ক্ষতি করে, আর এন্টারোভাইরাস সরাসরি হৃদ্‌পেশিতে সংক্রমণ ঘটাতে পারে বলে জানান রবার্টস।

তিনি বলেন, “সাধারণত ভাইরাসজনিত অসুস্থতা যত গুরুতর হয়, হৃদরোগের ঝুঁকিও তত বাড়ে।” এসব সংক্রমণ পূর্বে বিদ্যমান হার্ট ফেলিওরের মতো রোগও আরও খারাপ করতে পারে।

ড. কাওয়াই বলেন, “ভাইরাস অনুযায়ী ঝুঁকি ভিন্ন হতে পারে। কেবল যাদের আগেই হৃদরোগের ঝুঁকি আছে তারাই নয়, তরুণ ও আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ ব্যক্তিরাও সংক্রমণের পর বাড়তি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।”

প্রতিরোধই সেরা উপায়

গবেষকরা বলেন, “আমাদের গবেষণা দেখায়, হৃদরোগের ঝুঁকির প্রচলিত কারণগুলো যাদের আছে, তাদের জন্য প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ যেমন টিকা ও সময়মতো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

ড. রবার্টস বলেন, “বিভিন্ন ভাইরাসের টিকা বিদ্যমান এবং এসব টিকা গুরুতর সংক্রমণ কমিয়ে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সাহায্য করে। কারণ টিকা নেওয়া ব্যক্তির সংক্রমণ সাধারণত হালকা হয়।”

কাওয়াই আরও জানান, টিকায় ব্যবহৃত নিষ্ক্রিয় ভাইরাস শরীরে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে না এবং তা হৃদ্‌পেশি আক্রমণ করতে সক্ষম নয়, ফলে এটি নিরাপদ ও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

ডাক্তাররা পরামর্শ দিচ্ছেন, যাদের সংক্রমণের পর হৃদরোগ নিয়ে উদ্বেগ আছে, তারা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।