পেহেলগামের রক্তাক্ত প্রহর যেন পুরো উপমহাদেশকে নতুন করে উত্তেজনার আগুনে জ্বালিয়ে দিল। পর্যটকদের ওপর সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলায় ২৬ জনের মৃত্যু শুধু কান্না বা ক্ষোভই নয়, রাজনৈতিক টানাপোড়েনকেও চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। আর সেই উত্তাপে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক।
বুধবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবনে ডাকা হয় জরুরি বৈঠক। প্রায় আড়াই ঘণ্টার সেই বৈঠকের শেষে বেরিয়ে কেন্দ্র সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়ে দেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নেওয়া পাঁচটি কড়া পদক্ষেপের কথা। ভারত জানিয়ে দেয়—জঙ্গি হামলার জবাব শুধু সীমান্তে নয়, কূটনৈতিক আঙিনাতেও দেওয়া হবে।
ভারতের ঘোষণা:
সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি স্থগিত – ১৯৬০ সালের ঐতিহাসিক চুক্তি আপাতত স্থগিত, সন্ত্রাসে মদত বন্ধ না হলে জলপথও বন্ধ থাকবে।
অটারি সীমান্ত বন্ধ – সীমান্ত দিয়ে যাতায়াত বন্ধ, কেবল ফিরতি যাত্রীদের জন্য ১ মে পর্যন্ত সময়সীমা।
সার্ক ভিসা বাতিল – পাকিস্তানি নাগরিকদের দেওয়া সব ভিসা বাতিল; ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশ।
পাক দূতাবাসে সামরিক উপদেষ্টাদের ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা – ভারতে নিযুক্ত উপদেষ্টারা দেশে ফিরে যাবেন।
দূতাবাসে সদস্যসংখ্যা কমানো – পাকিস্তানি দূতাবাসে কূটনীতিক সংখ্যা ৫৫ থেকে নামিয়ে ৩০।
এই ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইসলামাবাদও বসে থাকেনি। পাল্টা দিয়েছে আরও জোরালো বার্তা—ভারতের পাঁচের বিরুদ্ধে আটটি সিদ্ধান্ত, সঙ্গে কড়া ভাষার বিবৃতি।
পাকিস্তান যা বলছে:
“কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত রাজনৈতিক ইস্যু, জাতিসংঘের স্বীকৃতি রয়েছে। ভারত কাশ্মীরে নিপীড়ন চালাচ্ছে এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ করছে। পেহেলগামের ঘটনার দায় পাকিস্তানের ওপর চাপানো ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
পাকিস্তানের আট দফা সিদ্ধান্ত:
সিন্ধু চুক্তি বাতিলের ভারতীয় সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান – পানি প্রবাহ বন্ধের চেষ্টাকে যুদ্ধের সমতুল্য ঘোষণা।
সব দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্থগিতের অধিকার সংরক্ষণ – বিশেষত সিমলা চুক্তি।
ওয়াঘা সীমান্ত বন্ধ ঘোষণা – যাতায়াত বন্ধ, ফেরার সময়সীমা ৩০ এপ্রিল।
ভারতীয়দের সার্ক ভিসা বাতিল – ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তান ছাড়তে হবে।
ভারতীয় সামরিক উপদেষ্টারা ‘অবাঞ্ছিত’ – ইসলামাবাদ থেকে বিদায়ের নির্দেশ।
ভারতীয় দূতাবাসে সদস্য সংখ্যা কমিয়ে ৩০
ভারতের জন্য আকাশপথ বন্ধ – ভারতীয় বা ভারতের নিয়ন্ত্রিত বিমানের পাকিস্তান অভিগমনে নিষেধাজ্ঞা।
ভারতের সঙ্গে সব বাণিজ্য বন্ধ – এমনকি তৃতীয় দেশের পণ্য পরিবহনেও নিষেধাজ্ঞা।
এই টানাপোড়েনে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানও। দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের এমন তীব্র অবস্থান বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন দরকার সংলাপ ও কূটনৈতিক সংযম। নইলে এই উত্তপ্ত রাজনীতি ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে উপমহাদেশকে।